Wednesday, 12 August 2026

Lecture 3: Module 1 Session 3

 

প্রশিক্ষণার্থী ম্যানুয়াল মডিউল- এর "সেশন-: ওষুধ সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান" অংশের মূল পাঠ্য নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো: (Reference book Page Number 18-33)

Lecture 3: Module 1 Session 3 :

https://drive.google.com/file/d/1dtk8yIVdPjEXqnoA3ZeKnuxdADT4nMjR/view?usp=sharing

 

সেশন-: ওষুধ সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান

ওষুধ কি

অসুখ হলে আমরা ডাক্তারের কাছে যাই। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু ওষুধের নাম লিখে দেন। আমরা সেই সব ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে উঠি। তাই সাধারণভাবে বলা যায় যে, যা গ্রহণের মাধ্যমে আমরা রোগমুক্ত হই তাই ওষুধ। ওষুধটি কেমন হবে তা নির্ভর করে আমরা কোন ধরনের ডাক্তারের কাছে যাই তার ওপর। এ্যালোপ্যাথি ডাক্তার সাধারণত ট্যাবলেট, ক্যাপসুল বা সিরাপ খেতে দেন। অন্যদিকে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার দেন সাদা মিষ্টি পাউডারের পুরিয়া, ছোট ছোট সাদা দানার মত বড়ি বা কোন তরল যা ড্রপারে করে এক বা দুই ফোঁটা খেতে হয়। আবার কবিরাজ দেন বিদঘুটে স্বাদের লতাপাতার পাচন। যে ধরনের ডাক্তারের কাছেই আমরা যাই না কেন, প্রত্যেকেই কিছুনা কিছু ওষুধ দেন আরোগ্য লাভের জন্য। সুতরাং বলা যায় যে, ওষুধের উদ্দেশ্য একটাই- রোগমুক্তি।

চিকিৎসাশাস্ত্র ওষুধের সংজ্ঞা দেয় আরেকটু ব্যাপকভাবে। এই মতে, সুস্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণ, রোগ প্রতিরোধ এবং অসুস্থতা থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য আমরা যা যা করি তার সবই ওষুধের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ একজন ডায়াবেটিস রোগীর কথা ধরা যাক। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি মুখে ওষুধ খান, সকাল বিকাল ঘন্টা করে হাঁটেন, চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলেন, প্রতিবেলায় পরিমাণমত খাবার খান ইত্যাদি। আমরা জানি ডায়াবেটিস এমন একটি অসুখ যা কখনই সম্পূর্ণ ভাল হয় না, এই রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় মাত্র। অর্থাৎ সুস্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই রোগীকে অবশ্যই অনেকগুলো কাজ করতে হবে বা বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। শুধুমাত্র মুখে ওষুধ খাওয়াই যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, খাদ্যাভাস সবগুলোরই সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।

ওষুধের ইংরেজি পরিভাষা হিসেবে ড্রাগ (Drug) অথবা মেডিসিন (Medicine) দুটোকেই সাধারণত ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী যে কোন বস্তু যা গ্রহণের পর শরীরে প্রতিক্রিয়া তৈরিতে সক্ষম তাকে ড্রাগ বলে। যেমন সিগারেট বা তামাকের নিকোটিন, চা-কফির ক্যাফেইন প্রভৃতি। সাধারণত ড্রাগ ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। ড্রাগ রোগমুক্তি, রোগ প্রতিরোধ, রোগ সনাক্তকরণ এমনকি নেশাদ্রব্য হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে যে সব ড্রাগ শুধুমাত্র রোগমুক্তি রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয় তাদেরকে মেডিসিন বলে। যেমন এ্যান্টিবায়োটিক। একজন দক্ষ ওষুধবিজ্ঞানী তার জ্ঞান কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ড্রাগকে ওষুধে পরিণত করেন।

ড্রাগ সাধারণত দুটি উৎস হতে প্রাপ্ত

. প্রাকৃতিক উৎস: বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ, প্রাণীদেহ এবং খনিজ হতে প্রাপ্ত।

. কৃত্রিম উৎস: ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়।

ড্রাগকে বিশুদ্ধ রূপে আহরণ করে তার সাথে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে তৈরি হয় মেডিসিন। আমরা ওষুধের দোকানে যে বিভিন্ন রকম ওষুধ সাজানো অবস্থায় দেখি প্রকৃতপক্ষে তাই মেডিসিন।

ওষুধের ইতিহাস

প্রাচীনকালে মানুষ রোগমুক্তির জন্য যেসব ওষুধ ব্যবহার করতো তার অধিকাংশই ছিল ভেষজ। ভেষজ ওষুধের ইতিহাস মানব সভ্যতার মতই পুরোনো। বিভিন্ন প্রাচীন নথি-পত্রে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, খ্রিস্টজন্মের বহু আগে থেকেই চীন, ভারত, মিশর, গ্রীস ইত্যাদি সভ্যতায় গাছ-গাছড়া, লতাপাতা থেকে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করা হতো। 'এবারস্ প্যাপিরাস' (Ebers' Papyrus) হল এমনই এক প্রমাণ যা খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ১৬০০ বছর আগে লিখিত। এটি একটি ৬০ ফুট লম্বা এবং ফুট চওড়া কাগজের স্কুল যা অনায়াসে গুটিয়ে রাখা যায়। এতে আছে বিভিন্ন ধরনের ৭০০টি ওষুধের বর্ণনা এবং ৮০০টিরও বেশি ফর্মুলা যা চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। সব ওষুধের মধ্যে রয়েছে এমন সব বিভিন্ন ওষুধের বর্ণনা যার অনেকগুলোই এমনকি বর্তমান শতাব্দীতেও ব্যবহার করা হয়।

ইমহোটেপ

ঐতিহাসিকরা ইমহোটেপ নামে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৭২৫ সালে (অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৪৭৪৪ বছর আগে) জন্মগ্রহণকারী মিশরের একজন বিখ্যাত চিকিৎসকের সন্ধান পেয়েছেন যিনি মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য মমি তৈরির কৌশল আবিস্কার করেন। পিরামিডের ভেতরে যে মমি পাওয়া যায় তা তিনি তৈরি করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। অসামান্য প্রতিভার ইমহোটেপ ছিলেন একজন মিশরীয় সম্রাট বা ফারাও। কিন্তু তিনি অতি সাধারণ পোশাক পরতেন এবং সাদাসিদা জীবনযাপন করতেন। তিনি ইতিহাসে একাধারে প্রথম স্থপতি, প্রথম প্রকৌশলী এবং প্রথম চিকিৎসক হিসেবে বিবেচিত। অনেক প্রাচীন কালের হওয়াতে তাঁর কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিবরণ পাওয়া যায় না। এবারস্ প্যাপিরাস অনুযায়ী তিনি অনেক গাছগাছড়া ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করেছেন যার মধ্যে এসফাটিডা, খেজুর, রসুন, ক্যাস্টর অয়েল ইত্যাদি রয়েছে। তিনি যুদ্ধে আহত সৈন্যদের হাড় জোড়া লাগানোর জন্য বিশেষ ব্যান্ডেজ লতাগুল্ম ব্যবহার করতেন। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ইমহোটেপ কিভাবে এত জটিল চিকিৎসা করতেন তা ভাবতে বিস্ময় জাগে।

শেন নাং

চীনারা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ,০০০ বছর আগে থেকে ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করত। খ্রিস্টপূর্ব ,০০০ সালে চীনের সম্রাট শেন নাং রচনা করেন 'পেন্টি-সাও' (Pen-ti-Sao) নামের এক ভেষজ গ্রন্থ। এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরনো চৈনিক ওষুধ বিষয়ক বই। তিনি চীনের সম্রাট হলেও সাধারণ মানুষের মত জীবনযাপন করতেন। এমনকি নতুন ওষুধ নিজের শরীরেও প্রয়োগ করতেন। তার গাছপালার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। সেই সময় একবার চীনে শিকারের অভাবে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে শেন নাং তাঁর জনগণকে চাষাবাদে উৎসাহিত করেন। এসময় তিনি তাদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষা দান করেন। তাঁর এই অবদানের জন্য তাকে চীনের কৃষির জনক বলা হয়। কথিত আছে যে, শেন নাং প্রথম চা আবিষ্কার করেন। তিনি চা প্রস্তুত প্রণালী এবং এর ওষুধি গুণ সম্পকে জনগণকে অবহিত করেন। তিনি চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত উদ্ভিদের শ্রেণি বিন্যাস মানদণ্ড তৈরি করেন। এভাবে তিনি ৩৬৫টি উদ্ভিদ, প্রাণী এবং খনিজ ওষুধের তালিকা তৈরি করেন। শেন নাং যেসব ওষুধের কথা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে আজকের দিনেও ব্যবহৃত হয় এমন ওষুধ যেমন রুবার্ব, পডোফাইলাম, জিনসেং, ইফিড্রা ইত্যাদি রয়েছে। তাঁর এই কাজকে চৈনিক ফার্মাকোপিয়ার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।

চরক

ভারতীয় সভ্যতার চিকিৎসকেরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভেষজ লতা-পাতাকে তাদের ওষুধি গুণ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৮০০ সালে চরক তাঁর লিখিত 'চরক সংহিতা' বইতে এরকম ৫০টি শ্রেণি তৈরি করেন যার প্রতিটিতে ছিল ১০টি করে ওষুধ। তাঁর মতে এই ৫০ ধরনের ওষুধ ছিল একজন চিকিৎসকের মূল হাতিয়ার। চরক ছিলেন কাশীর মহারাজার রাজবৈদ্য। তিনি তাঁর ওষুধগুলোকে 'আসব', 'অরিস্ট', 'বটিকা', চূর্ণ', 'তৈল' ইত্যাদি উপস্থাপনায় বা ডোজেস্ ফর্মে তৈরি করতেন। তাঁর চিন্তাধারা চিকিৎসা পদ্ধতির হাত ধরেই আজকের আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠা। তাঁর 'চরক সংহিতা' বইটিই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের প্রথম বই। তিনি শারীরবিদ্যা, রোগতত্ত্ব এবং ভ্রূণ বিদ্যার সুপন্ডিত ছিলেন। তিনি ওষুধের উৎসগুলোকে উদ্ভিজ, প্রাণীজ খনিজ -- এই তিনভাগে বিভক্ত করেন। তাঁর বই থেকে আমরা আজ থেকে প্রায় ,৮০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে কী ধরনের অসুখ হতো, সেগুলোর চিকিৎসায় কী ওষুধ ব্যবহার হতো, কীভাবে সেগুলো তৈরি হতো, কোন্ মাত্রায় ব্যবহার হতো, এমনকি রোগীর পথ্য কী হবে এসব বিষয়ে জানতে পারি। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা তাঁকে 'ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক' বলে অভিহিত করেন।

শুশ্রুত

একইভাবে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬০০ সালে শুশ্রুত তাঁর 'শুশ্রুত সংহিতা' বইতে ৭৬০ ধরনের ওষুধকে তাদের সাধারণ গুণ অনুযায়ী ৭টি ভাগে ভাগ করেন। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় চিকিৎসার পাশাপাশি তিনিই প্রথম অস্ত্রোপচার প্রবর্তন করেন। ভারতীয় সভ্যতায় তিনি অস্ত্রোপচার বা শল্যবিদ্যায় অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত ১২০টি বিভিন্ন যন্ত্রপাতির নকশা লিপিবদ্ধ করেন যা আজও অনুসরণ করা হয়। তিনি ছিলেন বেনারসের অধিবাসী, গঙ্গা নদীর তীরে ছিল তাঁর হাসপাতাল। চরক এবং শুশ্রুত যে কাজ করে গেছেন সেগুলোই আজকের আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্রের ভিত। ভারতীয় জনগণের একটি বড় অংশ এখনও আয়ুবেদীয় শাস্ত্রমতে চিকিৎসা গ্রহণ করে।

হিপোক্রাটিস্

ওষুধ বিজ্ঞানের ইতিহাসে ইউরোপের বিশেষ করে গ্রিস রোমের চিকিৎসকদের অবদান সুবিদিত। তাঁদের মধ্যে হিপোক্রাটিস্, ডিওসকোরাইডিস্, গ্যালেন প্রমুখ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। হিপোক্রাটিস এতোই বিখ্যাত যে তাঁকে ইউরোপ মহাদেশের বিজ্ঞানীরা 'ফাদার অব মেডিসিন' নামে অভিহিত করেন। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৪২৫ সালে গ্রিসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লিখিত বইয়ের নাম 'ম্যাটেরিয়া মেডিকা' যা তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর পর্যন্ত মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পড়ানো হতো। বইটিতে অসংখ্য গাছগাছড়াজাত ওষুধ, সেগুলো তৈরির প্রক্রিয়া, সেবনবিধি মাত্রা ইত্যাদি রয়েছে। তিনি চিকিৎসকদের নৈতিকতার ওপর খুব জোর দিতেন। যে কারণে নবীন চিকিৎসকদের পেশায় প্রবেশকালে নৈতিকতার শপথ নেয়ার জন্য 'হিপোক্রাটিক ওথ' রচনা করেন, যা আজো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনুসরণ করা হয়।

ডিওসকোরাইডিস্

ডিওসকোরাইডিস্ ৩০ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কে জন্মগ্রহণ করলেও পরবর্তীতে রোমে চলে যান এবং কালক্রমে সেখানে বিখ্যাত সম্রাট নিরোর প্রধান চিকিৎসক নিযুক্ত হন। সম্রাট সেনাবাহিনীর সাথে তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের চাইতে সেই সব দেশের চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে তথ্য বিনিময়ে তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন। এভাবে তিনি বিভিন্ন দেশের সহস্রাধিক গাছগাছড়ার ছবি একে এগুলোর ওষুধি গুণাগুণের কথা লিপিবদ্ধ করে 'দ্য মেটেরিয়া মেডিকা' নামে বই লিখে গেছেন। পরবর্তীকালে তাঁর এই গ্রন্থ ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ভারতে অনেকগুলো ভাষায় অনুবাদ করা হয়। তাঁর মৃত্যুর দেড় হাজার বছর পরেও এই বইটি মেডিকেল ছাত্রদের পাঠ্য ছিল।

গ্যালেন

রোমের আরেকজন অত্যন্ত বিখ্যাত চিকিৎসক গ্যালেন ১৩০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে তিনি ছিলেন প্রথম ফার্মাসিস্ট, কারণ তিনি চিকিৎসার পাশাপাশি ওষুধসামগ্রী প্রস্তুত বিক্রি করতেন। তিনি মলমকে উন্নত করেন, ইমালশান আবিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে এখান থেকে সর্বপ্রথম কোল্ড ক্রীম তৈরি করেন। তাঁর লেখা, চিন্তাধারা চিকিৎসা পদ্ধতি প্রায় দুই হাজার বছর ধরে চিকিৎসা শাস্ত্রকে প্রভাবিত করছে। তিনি ছিলেন হিপোক্রাটিসের চিন্তাধারার সমর্থক। তিনি বিশেষ করে শারীরবিদ্যার বিভিন্ন অজানা দিক উন্মোচন করেন। সে সময় রোমে শব ব্যবচ্ছেদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু গ্যালেন থেমে যাননি। তিনি বানর শুকরের দেহ ব্যবচ্ছেদ করেন এবং ধারণা করেন যে এদের সাথে মানবদেহের অনেক মিল রয়েছে। গ্যালেন স্নায়ুতন্ত্রের উপর বহু পরীক্ষা করে তত্ত্ব প্রদান করেন যে, 'মস্তিষ্ক সব মাংসপেশীর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে'

আল রাজী

অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় আরব চিকিৎসকদের ইতিহাস অত্যন্ত নবীন। মাত্র প্রায় ,০০০ বছর পূর্বে এই চিকিৎসকরা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তাঁদের অসামান্য জ্ঞান-প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। এঁদের মধ্যে আল রাজী, ইবনে সিনা প্রমুখ ছিলেন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। আল রাজী চিকিৎসার মূল ভিত্তি হিসাবে রসায়নকে গ্রহণ করেন। তখন রসায়নকে বলা হতো 'আল-কেমি' তিনি রসায়ন শাস্ত্রের অত্যন্ত বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ছিলেন। তিনিই প্রথম চিকিৎসা ক্ষেত্রে গাছগাছড়ার বদলে মূল উপাদান বা পিওর কেমিক্যাল ব্যবহার শুরু করেন। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা আল রাজীকে 'র‍্যাজেস্' নামে ডাকে। তিনি ৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইরানে জন্মগ্রহণ করেন। পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন ইরাকের বাগদাদে অবস্থিত বিখ্যাত মুক্তাদারি হাসপাতালের প্রধান। তিনিই প্রথম গুটি বসন্ত হামের চিকিৎসা শুরু করেন। ফুলের পরাগ রেণু থেকেও যে এলার্জি হতে পারে তা তিনিই প্রমাণ করেন। এছাড়া তিনিটাই প্রথম অনুধাবন করেন যে, শরীরে রোগ বিকাশের সাধারণ প্রথম ধাপ হলো জ্বর। 'কিতাব আল মনসুরি', 'আল-হাউয়ি', 'মানলা ইয়াহদুরু আল-তাবীব' ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ।

ইবনে সিনা

ইবনে সিনা ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওষুধকে আধুনিক আকর্ষণীয় করার নিয়মের প্রবক্তা। তিনি তিক্ত বিস্বাদ ওষুধকে সুমিষ্ট, সুস্বাদু সুগন্ধময় করার উপায় হিসাবে সিরাপ আবিষ্কার করেন। বটিকাকে চিনির প্রলেপ দিয়ে 'সুগার কোটেড' করেন। হাতের বদলে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বটিকা তৈরির জন্য কাঠের ছাঁচ তৈরি করেন, পরবর্তীতে যার অনুকরণে ট্যাবলেট মেশিন আবিষ্কৃত হয়। তিনি ইউনানি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে এতটাই উন্নত করেন যে তাঁকে ইউনানি চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রধান বিজ্ঞানী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'কানুন' সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই বইটি থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি গ্রিক আরব বিজ্ঞানীবৃন্দ এবং ভারতের চরক শুশ্রুত দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এদের ভাল দিকগুলো গ্রহণ করেছিলেন। ইবনে সিনা অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন ফার্মাকোলজীতে তাঁর অসামান্য অবদানের কারণে। তিনিই প্রথম সংক্রামক রোগ এবং যৌন রোগের ধারণা দেন। তিনি রোগের শ্রেণিবিন্যাস করেন এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রণয়ন করেন। স্বাস্থ্যবিধির আওতায় রোগ সংক্রমণকালে রোগীকে পৃথকভাবে রাখার ব্যবস্থারও প্রবর্তক তিনি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে রাজ-রোষের শিকার হয়ে ইবনে সিনাকে অকালে প্রাণ দিতে হয়।

চিকিৎসার ধারা অনুযায়ী ওষুধের শ্রেণিবিভাগ

সাধারণভাবে আমরা যে সব ওষুধ গ্রহণ করি তার বেশির ভাগই হচ্ছে বিভিন্ন রাসায়নিক। এছাড়া অন্যান্য ধরনের ওষুধও রয়েছে। এখানে চিকিৎসাধারা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ওষুধের কথা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

  • এলোপ্যাথি (Allopathy): বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে গাছগাছড়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধের মূল উপাদান দিয়ে চিকিৎসা করার জন্য এই পদ্ধতি। এটি বর্তমান সময়ের মূলধারার ওষুধ যা দ্রুত রোগ উপশম করে। এই জন্য চিকিৎসক রোগীদের কাছে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দিয়ে ধরনের ওষুধ তৈরি হয়। এটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ এবং সুনির্দিষ্ট রোগের ওপর কাজ করে বলে এর কার্যক্ষমতা বেশি। এলোপ্যাথি ওষুধের মূল অসুবিধা হল এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার বিপজ্জনক। তাই রোগলক্ষণ ভালভাবে বুঝে এরপর এই ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়।
  • হোমিওপ্যাথি (Homeopathy): অষ্টাদশ শতকে জার্মান চিকিৎসক রসায়নবিদ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান হোমিওপ্যাথির ধারণা দেন। এই পদ্ধতিতে ওষুধ বিভিন্নমাত্রায় রোগীর শরীরে প্রয়োগ করা হয়। ওষুধের যে মাত্রায় রোগীর সমলক্ষণ প্রকাশিত হয় সেই মাত্রায় ওষুধ কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ থেকে হোমিওপ্যাথি ওষুধ তৈরি করা হয়। যেমন বেলাডোনা, নাক্সভমিকা, থুজা প্রভৃতি। হোমিও ওষুধের কার্যকারিতা অত্যন্ত ধীর। তাই রোগমুক্তির জন্য দীর্ঘসময়ের প্রয়োজন। একারণে সহজলভ্য দামে কম হলেও এটি মূলধারার ওষুধ হয়ে ওঠতে পারেনি।
  • আয়ুর্বেদীয় (Ayurveda): সুপ্রাচীন এই চিকিৎসাধারার ইতিহাস প্রায় ,০০০ বছরের। ভারতবর্ষে এর উৎপত্তি। ভারতের চরক, শুশ্রুত, ধন্বন্তরী, ভরদ্বাজ প্রমুখ এই ধারার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের কয়েকজন। চরক-সংহিতা শুশ্রুত-সংহিতা এর মূল ভিত্তি। আয়ুর্বেদ মতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যেমন বিভিন্ন উপাদানে তৈরি, তেমনি মানবদেহও বিভিন্ন উপাদানে তৈরি। যখন কোন উপাদানে ঘাটতি হয় তখন শরীর রোগাক্রান্ত হয়। উদ্ভিজ, প্রাণীজ বা খনিজ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ওষুধ উপযুক্ত পথ্যের সহায়তায় শরীরকে সুস্থ করে। আয়ুর্বেদ ধারায় চিকিৎসকেরা 'কবিরাজ' বা 'বৈদ্য' নামে পরিচিত।
  • ইউনানি (Unani): গ্রিসের ইউনান প্রদেশে সর্বপ্রথম এই ধারার উৎপত্তি বলে এটি ইউনানি নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে মধ্য যুগে ইবনে সিনাসহ আরবীয় চিকিৎসকগণ ইউনানি ধারাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। এধারায় রোগলক্ষণকে পাশ কাটিয়ে রোগের চিকিৎসা করা হয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রধানত রোগীর নাড়ির গতি, মল-মূত্র ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়। আয়ুর্বেদের মতো এখানেও উদ্ভিজ, প্রাণীজ বা খনিজ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। তবে আয়ুর্বেদের সাথে এর প্রধান পার্থক্য হলো এই চিকিৎসা ব্যবস্থায় ওষুধকে সুমিষ্ট, সুস্বাদু সুগন্ধময় করে তৈরি করা হয়। এই ধারার চিকিৎসকেরা 'হেকিম' বা 'হাকিম' বা 'তিব্ব' নামে পরিচিত।

ওষুধের ব্যবহার/অপব্যবহার

ফার্মাসিস্টরা যখন ফার্মেসীতে কাজ করেন তখন তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেকোন প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র সরাসরি ফার্মেসীতে আসে ওষুধ ক্রয়ের জন্য। যে সকল ফার্মাসিস্টরা ওষুধের দোকানে কাজ করেন, তাদের সামাজিক দায়িত্ব অনেক। ওষুধের দোকানে ফার্মাসিস্টকে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকতে হয়। রোগী বা রোগীর কোন আত্মীয় ওষুধ কিনতে দোকানে এলে প্রথমে সাক্ষাত দেন ফার্মাসিস্ট। সাধারণত (রোগীর) ব্যবস্থাপত্র অনুসারে ফার্মাসিস্ট প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং পথ্য সর্ম্পকে রোগীকে ধারণা দিয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ কেনা বা বিক্রির প্রবণতা নিয়মিত ব্যাপার। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া প্রতিদিন শত শত এন্টিবায়োটিক যেমন সেফরাডিন, সেফিক্সিম, সেফুরক্সিম, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, লিভোফ্লক্সাসিন ইত্যাদি ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। এন্টিবায়োটিক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র থাকা বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অতএব কোন ফার্মাসিস্ট যদি রোগী চাহিবারমাত্র অথবা রোগী কোন রোগের উপসর্গের কথা বলামাত্র এন্টিবায়োটিক দিয়ে দেন, তাহলে এটি শুধু ওষুধের অপব্যবহারই নয় বরং এটি একটি মারাত্মক অপরাধ।

() প্রেসক্রিপশনে বর্ণিত সময় অনুযায়ী ওষুধ না খেলে ওষুধের অপব্যবহার হবে, ওষুধ যথার্থভাবে শরীরে কাজ করবে না এবং নতুন জটিলতার সৃষ্টি করবে:

() প্রেসক্রিপশনে বর্ণিত নির্দেশিত দিন পর্যন্ত ওষুধ না খেলে ওষুধের অপব্যবহার হবে।

ওষুধের সঠিক ব্যবহারে ফার্মাসিস্টের দায়িত্ব কর্তব্য

() প্রথমে প্রেসক্রিপশনটি নির্ভুলভাবে পড়তে বুঝতে হবে;

() ওষুধের নাম, ওষুধের ধরন (Dosage Form), ওষুধের মাত্রা (Dose), কতবার খেতে হবে (Doses Frequency) এবং কতদিন (Course) তা পড়ে দেখতে হবে;

() প্রেসক্রিপশনে কোন পথ্য নির্দেশনা আছে কিনা তা পড়ে দেখতে হবে;

() কোন এন্টিবায়োটিকের নাম লেখা আছে কিনা দেখতে হবে;

() কোন জটিল রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি রোগের ওষুধের নাম আছে কিনা দেখতে হবে;

() কোন্ ধরনের রোগী যেমন শিশু, কিশোর, প্রাপ্তবয়ষ্ক, বয়োজ্যেষ্ঠ ইত্যাদি বিবেচনা করতে হবে।

স্বাস্থ্য সেবায় দেশীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা

উন্নয়নশীল অনুন্নত দেশগুলির স্বাস্থ্য বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (যেমন উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রায় শতাংশ অনুন্নত দেশের জন্য প্রায় ২০ শতাংশ) আসে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলির কাছ থেকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংস্থা এবং দেশীয় এন.জি. বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সমস্যার/ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এসব সংস্থাকে নিম্নোক্ত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:

) মাল্টিল্যাটেরাল এজেন্সি বা বহুমাত্রিক সংস্থা

) বাইল্যাটেরাল এজেন্সি বা দ্বিপাক্ষিক সংস্থা

) এনজিও

) মাল্টিল্যাটেরাল এজেন্সি বা বহুমাত্রিক সংস্থা

যেসব এজেন্সির অর্থ সাহায্য বিভিন্ন দেশের সরকার অন্যান্য উৎস হতে প্রাপ্ত তাকে মাল্টিল্যাটেরাল এজেন্সি বা বহুমাত্রিক সংস্থা বলা হয়। এই ধরনের অধিকাংশ সংস্থার উৎপত্তি জাতিসংঘ হতে। বাংলাদেশে যেসব বহুমাত্রিক সংস্থা স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা হলো:

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (সংক্ষেপে WHO);
  • জাতিসংঘের শিশু তহবিল বা ইউনিসেফ;
  • বিশ্ব ব্যাংক বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক;
  • জাতিসংঘের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ তহবিল বা ইউএনএফপিএ;
  • জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপি।
  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO): এটি জাতিসংঘের স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা। একে বলা হয় জাতিসংঘের স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তঃসরকার সংস্থা। এর সংবিধান মোতাবেক এই সংস্থাটির প্রধানতম উদ্দেশ্য হচ্ছে 'সর্বোচ্চ সম্ভব পর্যায়ে জনসাধারণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা' এর প্রধান কাজ হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচিগুলোর সঠিক নির্দেশনা দেওয়া এগুলোর সঠিক সমন্বয় সাধন করা। এই সংস্থাটির কার্যাবলীর মধ্যে আরো আছে বিভিন্ন দেশ সংস্থাকে স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য প্রদান করা, স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা কাজকে উৎসাহিত করা, বিভিন্ন সংস্থা ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা ইত্যাদি। এই সংস্থা বিভিন্ন উন্নত দেশের সরকার বিভিন্ন সংস্থা এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ের দাতাদের কাছ থেকেও আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করে এবং তাদের বাজেট অনুযায়ী বিভিন্ন উন্নয়নশীল অনুন্নত দেশে বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিতে অর্থ সাহায্য প্রদান করে। এইডস্ অন্যান্য যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ বিষয়ক প্রকল্পের জন্য এর বিশেষ আলাদা বাজেট রয়েছে। বাংলাদেশে সংস্থাটি যেসব রোগ নিয়ে নিয়ন্ত্রণ সচেতনতামূলক কার্য পরিচালনা করে তার মধ্যে রয়েছে গোদ রোগ, কালাজ্বর, কুষ্ঠ, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, কৃমি, এইডস্ বার্ড ফু। এছাড়া পরিবেশ, স্বাস্থ্যবিধান, আবহাওয়া পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় নিয়েও সংস্থাটি বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছে।
  • ইউনিসেফ (UNICEF): ইউনিসেফ মূলত শিশুদের নিয়ে কাজ করে। ইউনিসেফের বাজেটের বৃহদাংশ ব্যবহার করা হয় স্বাস্থ্য বিষয়ক খাতে। এই সংস্থা শিশুদের স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় বলে অত্যন্ত দরিদ্র দেশগুলির অনুর্ধ বছর এর শিশু যাদের স্বাস্থ্য সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ তাদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এর সম্পদের সিংহভাগ খরচ করে থাকে। ইউনিসেফ-এর বাজেটের শতকরা ৭০ ভাগ আসে বিভিন্ন সরকারের দান হতে এবং বাকি ৩০ ভাগ আসে ব্যক্তি পর্যায়ের দাতাদের কাছ থেকে। এছাড়া ইউনিসেফ বিশ্বব্যাংক এর সাথে একত্রে বেশকিছু প্রকল্প পরিচালনা করে। ইউনিসেফ বাংলাদেশে নানাবিধ প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে যার মধ্যে রয়েছে মীনা কার্টুন, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যতত্ত্ব বিষয়ক কর্মশালা, শিশুশ্রম বিষয়ক কর্মশালা, শহরের বস্তিগুলিতে স্বাস্থ্যের মান উন্নয়ন ইত্যাদি।
  • বিশ্ব ব্যাংক (The World Bank): জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সংস্থাগুলির মধ্যে বিশ্ব ব্যাংক অন্যতম। বিশ্ব ব্যাংক দরিদ্র দেশগুলিকে সুবিধাজনক শর্তে স্বাস্থ্যশিক্ষা স্বাস্থ্য বিষয়ক উন্নয়নের জন্য ঋণ প্রদান করে যা প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি থেকে পাওয়া দুষ্কর। বর্তমানে স্বাস্থ্য বিষয়ক মানব সম্পদ উন্নয়ন খাতে ব্যাংকটির প্রদত্ত ঋণ বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত মোট ঋণের ২৫ শতাংশ এবং আগামীতে এই ঋণের পরিমাণ ৫০ শতাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রকল্প পরিচালনা করে। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যাগুলির মধ্যে বিশ্বব্যাংক মূলত এইডস্ নিয়ে বেশি মনোযোগী। বিভিন্ন এন.জি. এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় বিশ্ব ব্যাংক এইডস্ সম্পর্কিত নানাবিধ জনসচেতনামূলক প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে।
  • জাতিসংঘের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ তহবিল (UNFPA): জনসংখ্যা বৃদ্ধি বিশ্বের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা মূলত উন্নয়নশীল অনুন্নত দেশসমূহে বেশি প্রকট। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়, বরং এই সমস্যায় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে সংস্থাটি বিভিন্ন দেশে আর্থিক নানাবিধ কারিগরি সাহায্য প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাথে এই সংস্থাটি বেশ কিছু প্রকল্প পরিচালনা করে। এই সংস্থাটির মোট বাজেটের শতকরা ৫০-৬০ ভাগ অর্থ ব্যবহার করা হয় কারিগরি সুবিধা প্রদানে। এই সংস্থাটি তার বাজেটের শতকরা ৭০ ভাগ অর্থই প্রদান করে অনুন্নত দেশগুলিতে। ১৯৭৪ সাল থেকে এই সংস্থা বাংলাদেশ সরকারের সাথে কাজ করছে এবং এবিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে নানাবিধ কারিগরি পণ্য সহযোগিতা (যেমন জন্মনিরোধক পিল, কনডম ইত্যাদি) প্রদান করে আসছে। সংস্থাটি বাংলাদেশে মূলত প্রজনন স্বাস্থ্য মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে।
  • জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP): এটি মূলত এইডস্, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার বিষয়ে কাজ করে থাকে। এর বাজেটের শতকরা প্রায় ২০ ভাগ প্রদান করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা কর্মসংস্থান বিষয়ক খাতে। এছাড়াও এই সংস্থাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় (ট্রপিক্যাল) জীবাণুদের বিষয়ে গবেষণামূলক প্রশিক্ষণমূলক প্রকল্প পরিচালনা করে। এই সংস্থা বাংলাদেশে এইডস্ আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে। এছাড়াও পরিবেশ সংক্রান্ত নানাবিধ প্রকল্প তারা পরিচালনা করছে।

) দ্বি-পাক্ষিক সংস্থা

এই ধরনের সংস্থাগুলি বিভিন্ন উন্নত দাতা দেশের অর্থ সাহায্যে গঠিত এবং তারা বিভিন্ন উন্নয়নশীল অনুন্নত দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সংস্থার অর্থ সাহায্য নির্ভর করে দাতা দেশের রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর। বাংলাদেশে কর্মরত দ্বি-পাক্ষিক সংস্থাগুলির মধ্যে নিম্নোক্ত সংস্থাগুলি মূল ভূমিকা পালন করে:

  • ইউএসএইড (USAID)
  • ইউকেএইড (UKaid)
  • জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা / JICA)
  • ইউএসএইড: এই সংস্থা বিভিন্ন দেশে তাদের নির্বাচিত বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে অর্থ সাহায্য প্রদান করে। মূলত জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য পুষ্টি বিষয়ক ক্ষেত্রে এসব অর্থ সাহায্য প্রদান করা হয়। সংস্থা বাংলাদেশে নারীদের প্রসূতিকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং এইডস্ এর ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে নানাবিধ প্রকল্প পরিচালনা করে।
  • ইউকেএইড: এই সংস্থা বিভিন্ন দেশে তাদের নির্বাচিত বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে অর্থ সাহায্য প্রদান করে। মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য পুষ্টি, ফার্মেসী সেবা বিষয়ক ক্ষেত্রে এসব অর্থ সাহায্য প্রদান করে।
  • জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা): জাপান সরকার বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বিষয়ক নানাবিধ প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে। তারা শিশু স্বাস্থ্য, প্রসূতিকালীন স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে সর্বাধিক অর্থসাহায্য প্রদান করে থাকে।

) এনজিও

বাংলাদেশে সরকার নিবন্ধিত প্রায় ৪০০ (চারশত) এন.জি.. বা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বিভিন্নভাবে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নানাবিধ কাজ করছে। এসব সংস্থা, বিভিন্ন দেশী-বিদেশী দাতা সংস্থা থেকে তাদের অর্থযোগান নিশ্চিত করে এবং বিভিন্ন গ্রাম এলাকায় নানাবিধ কর্মসূচি স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালা পরিচালনা করে। বাংলাদেশে কার্যরত এন.জি..দের মধ্যে নিম্নোক্ত সংস্থাগুলি বিশেষভাবে পরিচিত:

  • সেভ দ্যা চিলড্রেন
  • ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস ফর হেলথ (এমএসএইচ)
  • গ্রামীণ ব্যাংক
  • ব্র্যাক
  • টিএমএসএস
  • আশা
  • কারিতাস ইত্যাদি
  • সেভ দ্যা চিলড্রেন: সেভ দ্যা চিলড্রেন সারা বিশ্বের শিশুদের স্বাস্থ্য অন্যান্য বিষয় নিয়ে কাজ করে থাকে। বাংলাদেশে সেভ দ্যা চিলড্রেন ইউএসএ এবং সেভ দ্যা চিলড্রেন অস্ট্রেলিয়া এই দুটি সংস্থাই কাজ করে থাকে। মূলত স্বাস্থ্য, পুষ্টি, এইডস্, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এরা বাংলাদেশে কাজ করছে।
  • ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস ফর হেলথ (এমএসএইচ): ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস ফর হেলথ (এমএসএইচ) একটি কারিগরী সহায়তা প্রদানকারী আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা সংস্থা। এমএসএইচ বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন দপ্তর/অধিদপ্তরসমূহের বিভিন্ন প্রকল্পে কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের এন.জি.. সমূহ দরিদ্র গ্রাম এলাকাগুলিতে এবং শহরের বিভিন্ন বস্তিতে স্বাস্থ্যসুবিধা বঞ্চিত জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞান বৃদ্ধিতে নানাবিধ প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, শিশু স্বাস্থ্য, শিশুদের পুষ্টি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ, পরিবার পরিকল্পনাসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি। এছাড়াও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন এন.জি.. বাংলাদেশে কাজ করে চলেছে। তাদের মধ্যে রেড ক্রিসেন্ট রেড ক্রস অন্যতম। এই দুটি সংস্থা তাদের বাজেট অন্যান্য নানাবিধ সাহায্যের প্রধান অংশ সংগ্রহ করে বিভিন্ন জাতীয় সংস্থাগুলি হতে। এই সংস্থা দুটি মূলত বিভিন্ন প্রাকৃতিক মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে তাদের সাহায্য প্রদান করে থাকে, যার মধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক সাহায্য অন্যতম।

পেশা হিসেবে ফার্মাসিস্ট

যে সব স্বাস্থ্য পেশাজীবী সরাসরি ওষুধ নিয়ে কাজ করেন মূলত তারাই ফার্মাসিস্ট হিসেবে বিবেচিত। ফার্মাসিস্ট পেশার মধ্যে রয়েছে ওষুধ তৈরি, ডিসপেন্সিং, রোগীকে ওষুধ সম্পর্কে জ্ঞান, ওষুধবিষয়ক সচেতনতা তৈরি, ওষুধ সংরক্ষণ, ওষুধ পরিবহন প্রভৃতি কর্মকাণ্ড। একজন ফার্মাসিস্টের সাধারণ দায়িত্বের মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি অন্যতম-

  • রোগীকে গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ প্রদান করা;
  • নিয়মনীতি মেনে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা;
  • ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীকে সঠিক ওষুধ প্রদান করা;
  • ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের নিয়মাবলি রোগীকে সঠিকভাবে জানানো;
  • সব ওষুধ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা, বিশেষভাবে সংরক্ষিতব্য ওষুধের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ;
  • মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ডিসপেন্স/বিক্রি না করা;
  • রোগীকে ডাক্তারের পরামর্শক্রমে ওষুধ গ্রহণে উৎসাহিত করা।

একজন ফার্মাসিস্ট কমিউনিটি ফার্মেসীর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারেন। কমিউনিটি ফার্মেসী হল স্বাস্থ্য সেবার প্রথম ধাপ। এবিষয়ে পরবর্তী সেশনগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এছাড়াও ফার্মাসিস্টরা ওষুধ উৎপাদন, ওষুধ বাজারজাতকরণ, ওষুধ গবেষণা, ওষুধ প্রশাসন প্রভৃতি কাজ করতে পারেন।

 

No comments:

Post a Comment

Q40 (L6 M3S2)

 Q40  (L6 M3S2)  (PCB 64 batch Grade-C certificate registration exam preparation)   নিচে দেওয়া লিঙ্কটিতে ঢুকে  কুইজ পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করুন।...